আন্তর্জাতিক ডেস্ক:মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্র, ইসরায়েল ও ইরানের মধ্যে নতুন করে সামরিক উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কার মধ্যেই পারমাণবিক হামলা থেকে বাঁচার উপায় নিয়ে নাগরিকদের জন্য বিশেষ নির্দেশনামূলক ভিডিও প্রকাশ করেছে ইরানের রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যম। আট মিনিটের ওই ভিডিওতে পারমাণবিক বিস্ফোরণ ঘটলে কীভাবে আশ্রয় নিতে হবে, তেজস্ক্রিয় ধূলিকণা থেকে কীভাবে নিরাপদ থাকতে হবে এবং পরবর্তী সময়ে কী করণীয়—তা বিস্তারিতভাবে তুলে ধরা হয়েছে।
গত ২৯ অক্টোবর ২০২৬ তারিখে ইরানের রাষ্ট্রীয় সংবাদ সংস্থা আইআরএনএ (IRNA) ভিডিওটি প্রকাশ করে। এতে ইসফাহান অঞ্চলের জরুরি সেবা ও রেড ক্রিসেন্টের কর্মকর্তাদের মাধ্যমে বিভিন্ন নিরাপত্তামূলক নির্দেশনা দেওয়া হয়। পরে ৩ নভেম্বর ইরানের রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনসহ আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমেও বিষয়টি আলোচনায় আসে।
ভিডিওতে বলা হয়েছে, পারমাণবিক বিস্ফোরণের তীব্র আলোর দিকে কখনো সরাসরি তাকানো যাবে না। বিস্ফোরণের সময় বাইরে অবস্থান করলে দ্রুত কোনো শক্ত দেয়াল বা আড়ালের পেছনে শুয়ে পড়তে হবে। মাথা ও মুখ ঢেকে রাখতে হবে। বিস্ফোরণের শকওয়েভ বা আঘাতের ঢেউ চলে যাওয়ার পর নিকটবর্তী মজবুত ভবনে আশ্রয় নিতে হবে। এ ক্ষেত্রে গাড়ির ভেতরে আশ্রয় নেওয়া নিরাপদ নয়।
আশ্রয়ের জন্য ভবনের বেসমেন্ট অথবা জানালা ও বাইরের দেয়াল থেকে দূরে কেন্দ্রীয় কোনো কক্ষকে সবচেয়ে নিরাপদ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। একই সঙ্গে দরজা-জানালা বন্ধ রাখা এবং বাইরের বাতাস প্রবেশ করে এমন শীতাতপনিয়ন্ত্রণ ও বায়ু চলাচল ব্যবস্থা বন্ধ রাখার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।
নির্দেশনায় আরও বলা হয়েছে, বাইরে থেকে আশ্রয়ে প্রবেশের পর বাইরের পোশাক খুলে পলিথিনের ব্যাগে ভালোভাবে মুড়িয়ে রাখতে হবে। পোশাক ঝাড়া যাবে না। এরপর সাবান ও পানি দিয়ে শরীরের উন্মুক্ত অংশ পরিষ্কার করতে হবে। অন্তত ২৪ ঘণ্টা নিরাপদ আশ্রয়ে অবস্থান, বোতলজাত পানি ও প্যাকেটজাত খাবার ব্যবহারের পরামর্শও দেওয়া হয়েছে। তবে কর্তৃপক্ষের নির্দেশনা ছাড়া আশ্রয়স্থল ত্যাগ না করার বিষয়েও গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
ইরানের ইসফাহান রেড ক্রিসেন্টের শিক্ষা ও গবেষণা উপপরিচালক ইব্রাহিম আদেলজাদেহ এবং প্রি-হসপিটাল ইমার্জেন্সি সার্ভিসের মুখপাত্র আব্বাস আবেদি ভিডিওতে এসব নির্দেশনার গুরুত্ব তুলে ধরেন।
এদিকে ইরানের পারমাণবিক স্থাপনা ঘিরে নতুন করে আন্তর্জাতিক মহলে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। মার্কিন রাজনৈতিক ভাষ্যকার ও সাবেক টেলিভিশন উপস্থাপক টাকার কার্লসন দাবি করেছেন, ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর চাপের মুখে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রশাসন কয়েক দিনের মধ্যে ইরানের একটি পারমাণবিক স্থাপনায় পারমাণবিক হামলার সিদ্ধান্ত নিতে পারে।
কার্লসনের দাবি অনুযায়ী, সম্ভাব্য লক্ষ্যবস্তু হতে পারে ইরানের মধ্যাঞ্চলে অবস্থিত ভূগর্ভস্থ পিকঅ্যাক্স মাউন্টেন (Pickaxe Mountain) স্থাপনা। তবে তাঁর এ দাবির পক্ষে কোনো প্রকাশ্য প্রমাণ পাওয়া যায়নি এবং যুক্তরাষ্ট্র বা ইসরায়েলের কোনো কর্মকর্তা এমন হামলার সিদ্ধান্তের বিষয়টি নিশ্চিত করেননি।
অন্যদিকে, মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এর আগে ইরানের বিরুদ্ধে পারমাণবিক অস্ত্র ব্যবহারের সম্ভাবনা নাকচ করেছেন বলে আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমে উল্লেখ করা হয়েছে। ফলে কার্লসনের বক্তব্যকে এখনই মার্কিন সরকারের আনুষ্ঠানিক সিদ্ধান্ত হিসেবে দেখার সুযোগ নেই।
বিশ্লেষকদের কাছে ইরানের এই নির্দেশনামূলক ভিডিও গুরুত্বপূর্ণ হলেও এটি প্রকাশের অর্থ এই নয় যে দেশটিতে আসন্ন পারমাণবিক হামলার বিষয়ে নিশ্চিত কোনো তথ্য রয়েছে। ইরানের নিয়মিত বেসামরিক প্রতিরক্ষা প্রস্তুতির অংশ হিসেবেও এমন নির্দেশনা প্রকাশিত হয়ে থাকতে পারে।
তবে বিশ্ব রাজনীতির বর্তমান বাস্তবতায় পারমাণবিক অস্ত্রের ব্যবহার নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। যে অস্ত্রের ভয়াবহতা একটি দেশ বা জাতির সীমানায় সীমাবদ্ধ থাকে না, বরং মানবসভ্যতা ও পরিবেশের জন্য দীর্ঘমেয়াদি বিপর্যয় ডেকে আনতে পারে, সেই অস্ত্র ব্যবহারের সম্ভাবনা নিয়ে যেকোনো আলোচনা বিশ্ববাসীর জন্য গভীর উদ্বেগের বিষয়।
পারমাণবিক শক্তির প্রতিযোগিতা নয়, মানবজাতির নিরাপত্তা ও বিশ্বশান্তিই হোক রাষ্ট্রগুলোর প্রধান অগ্রাধিকার।