নিজস্ব প্রতিবেদক:
কফি মানেই মন চনমনে করা সুবাস, তীব্র স্বাদ আর এক কাপ উষ্ণতায় প্রশান্তি। কিন্তু সেই কফিই যদি তৈরি হয় হাতি কিংবা গন্ধগোকুলের মল থেকে—তাহলে অবাক হওয়ারই কথা। শুনতে অদ্ভুত লাগলেও বিশ্বের বিভিন্ন দেশে এমনই দুই ধরনের বিরল ও বিলাসবহুল কফি তৈরি হচ্ছে। এর একটি থাইল্যান্ডের ‘ব্ল্যাক আইভরি কফি’, অন্যটি ইন্দোনেশিয়ার ‘কোপি লুওয়াক’।
দুটির উৎপাদন প্রক্রিয়াই বেশ ব্যতিক্রমী। প্রাণীর পরিপাকতন্ত্রের মধ্য দিয়ে যাওয়ার পর কফি বিন সংগ্রহ করে তা পরিষ্কার, শুকানো ও রোস্টিংয়ের মাধ্যমে তৈরি করা হয় এসব কফি। দুষ্প্রাপ্যতা, জটিল উৎপাদন প্রক্রিয়া এবং বিশেষ স্বাদের কারণে আন্তর্জাতিক বাজারে এগুলোর দামও সাধারণ কফির তুলনায় অনেক বেশি।
থাইল্যান্ডে তৈরি হয় বিশ্বের অন্যতম দামি কফি ‘ব্ল্যাক আইভরি’। এ কফি তৈরিতে উচ্চমানের আরাবিকা কফি চেরি হাতির খাবারের সঙ্গে মিশিয়ে দেওয়া হয়। হাতি সেই খাবার গ্রহণের পর প্রায় ১৫ থেকে ১৭ ঘণ্টার মধ্যে মল ত্যাগ করে। এরপর মল থেকে অত্যন্ত সতর্কতার সঙ্গে আস্ত কফি বিনগুলো সংগ্রহ করা হয়।
সংগৃহীত বিন ভালোভাবে পরিষ্কার করার পর রোদে শুকানো হয়। পরে নির্দিষ্ট তাপমাত্রায় রোস্টিংসহ কয়েকটি ধাপের প্রক্রিয়া শেষে তৈরি হয় ব্ল্যাক আইভরি কফি।
বিশেষজ্ঞদের মতে, হাতির পরিপাকতন্ত্রের মধ্য দিয়ে যাওয়ার সময় বিভিন্ন এনজাইমের প্রভাবে কফি বিনের কিছু প্রোটিন ভেঙে যায়। ফলে কফির স্বাভাবিক তিক্ততা তুলনামূলকভাবে কমে গিয়ে এতে চকোলেট, ক্যারামেল ও মাটির মতো হালকা মিষ্টি ঘ্রাণ-স্বাদের বৈশিষ্ট্য তৈরি হতে পারে।
তবে এ কফি উৎপাদন অত্যন্ত শ্রমসাধ্য এবং উৎপাদনের পরিমাণও সীমিত। ফলে এর দামও বেশ চড়া। আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতি কেজি ব্ল্যাক আইভরি কফির দাম প্রায় পৌনে দুই লাখ টাকা পর্যন্ত উঠতে পারে। বিলাসবহুল কিছু রেস্তোরাঁয় এক কাপ এই কফির জন্যও গুনতে হয় কয়েক হাজার টাকা।
আরেকটি আলোচিত ও দামী কফি হলো ইন্দোনেশিয়ার ‘কোপি লুওয়াক’। স্থানীয় ভাষায় ‘কোপি’ অর্থ কফি এবং ‘লুওয়াক’ বলতে বোঝানো হয় এশিয়ান পাম সিভেট বা গন্ধগোকুলকে।
বিড়ালসদৃশ এই নিশাচর স্তন্যপায়ী প্রাণী সাধারণত পাকা কফি চেরি খায়। ফলের মাংসল অংশ হজম হলেও কফির শক্ত বীজটি পুরোপুরি হজম হয় না। পরে সেটি মলের সঙ্গে শরীর থেকে বেরিয়ে আসে।
সেই মল থেকে কফি বিন সংগ্রহ করে পরিষ্কার ও শুকানো হয়। এরপর প্রয়োজনীয় প্রক্রিয়া শেষে রোস্টিং করে তৈরি করা হয় কোপি লুওয়াক।
গন্ধগোকুলের পরিপাকতন্ত্রের মধ্য দিয়ে যাওয়ার সময় কফি বিনে কিছু রাসায়নিক পরিবর্তন ঘটে বলে মনে করা হয়। এর ফলে কফির তীব্র অ্যাসিডিক বৈশিষ্ট্য কিছুটা কমে গিয়ে অপেক্ষাকৃত কোমল ও ভিন্নধর্মী স্বাদ তৈরি হতে পারে।
দুষ্প্রাপ্যতা ও জটিল উৎপাদন প্রক্রিয়ার কারণে কোপি লুওয়াকের দামও বিশ্ববাজারে বেশ চড়া। প্রতি পাউন্ডের দাম কয়েক শ মার্কিন ডলার পর্যন্ত হতে পারে।
প্রাণীর মল থেকে কফি তৈরির বিষয়টি শুনতে যতটা অদ্ভুত, বাস্তবে এর পেছনে রয়েছে দীর্ঘ ও শ্রমসাধ্য প্রক্রিয়া। সংগ্রহের পর কফি বিন পরিষ্কার, শুকানো এবং রোস্টিংয়ের প্রতিটি ধাপেই রাখতে হয় বিশেষ সতর্কতা।
তবে এসব কফি নিয়ে প্রাণী কল্যাণের বিষয়টিও আলোচনায় আসে। বিশেষ করে কোপি লুওয়াক উৎপাদনে খাঁচায় গন্ধগোকুল আটকে রাখার অভিযোগ নিয়ে বিভিন্ন সময়ে সমালোচনা হয়েছে। তাই এসব কফি কেনার ক্ষেত্রে উৎপাদন পদ্ধতি ও প্রাণীকল্যাণের বিষয়টিও বিবেচনায় রাখার পরামর্শ দেন সংশ্লিষ্টরা।
অদ্ভুত উৎপাদন প্রক্রিয়া, সীমিত সরবরাহ ও বিশেষ স্বাদের কারণে ব্ল্যাক আইভরি ও কোপি লুওয়াক এখন শুধু কফি নয়—বিশ্বের কফিপ্রেমীদের কাছে কৌতূহল, বিলাসিতা ও আভিজাত্যের এক অনন্য নাম।