রংপুর প্রতিনিধি:একসময় রংপুরের কৃষকের কাছে আলু ছিল ‘নগদ টাকার ফসল’। মৌসুম শেষে আলু বিক্রির অর্থ দিয়েই বছরের বড় একটি সময়ের সংসার চলত অনেক পরিবারের। কিন্তু উৎপাদন খরচ বৃদ্ধি, বাজারব্যবস্থার দুর্বলতা ও পর্যাপ্ত সংরক্ষণ সুবিধার অভাবে সেই আলুই এখন কৃষকের জন্য বড় দুশ্চিন্তার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। গত এক যুগে বারবার লোকসানের মুখে পড়ে আলু চাষ নিয়ে আগ্রহ হারাচ্ছেন অনেক কৃষক।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের (ডিএই) রংপুর আঞ্চলিক কার্যালয় ও কৃষি বিপণন অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, ২০১৪ থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্ত ১২ বছরের মধ্যে ৭ বছরই আলু চাষে লোকসান গুনেছেন কৃষকেরা। এ সময়ে ২০১৬, ২০১৯, ২০২০, ২০২৩ ও ২০২৪ সালে লাভের মুখ দেখলেও ২০১৪, ২০১৫, ২০১৭, ২০১৮, ২০২১, ২০২২ ও ২০২৫ সালে লোকসান হয়েছে।
সর্বশেষ ২০২৫–২৬ মৌসুমে প্রতি কেজি আলু উৎপাদনে কৃষকের খরচ হয়েছে প্রায় ১৬ টাকা। বস্তা ও মাঠ থেকে হিমাগার পর্যন্ত পরিবহন বাবদ আরও প্রায় ২ টাকা এবং হিমাগারে সংরক্ষণে ৬ টাকা ধরলে কেজিপ্রতি মোট ব্যয় দাঁড়ায় প্রায় ২৪ টাকা। অথচ বর্তমানে হিমাগার গেটে সেই আলু বিক্রি হচ্ছে গড়ে ১২ টাকায়। অর্থাৎ কেজিতে কৃষকের লোকসান প্রায় ১২ টাকা।
সরকার হিমাগার গেটে প্রতি কেজি আলুর দাম ২২ টাকা নির্ধারণ করলেও বাস্তবে সেই দামে আলু বিক্রি করতে পারছেন না কৃষকেরা। ফলে সরকারি নির্ধারিত মূল্য ও বাজারদরের মধ্যে বড় ধরনের ব্যবধান তৈরি হয়েছে।
রংপুর কৃষি বিপণন কার্যালয়ের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫–২৬ মৌসুমে জেলার ৪২টি হিমাগারে ৪ লাখ ৮৮ হাজার ৬৩৮ মেট্রিক টন আলু সংরক্ষণ করা হয়েছিল। গত ৩০ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত হিমাগারগুলোতে খাওয়ার আলু মজুত ছিল ২ লাখ ৮৪ হাজার ৬১৭ মেট্রিক টন। একই মৌসুমে জেলার ১ লাখ ৬৫ হাজার ৫০০ কৃষক ৬৬ হাজার ৪৫০ হেক্টর জমিতে আলু আবাদ করেন। উৎপাদন হয় প্রায় ১৯ লাখ ৫৭ হাজার টন।
এদিকে আলু বিক্রি করতে না পেরে হিমাগার থেকে বিপুল পরিমাণ আলু না তোলার ঘটনাও ঘটছে। বাংলাদেশ কোল্ড স্টোরেজ অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি মোস্তফা আজাদ চৌধুরী জানান, গত বছর শুধু রংপুরের আট উপজেলার কৃষকেরা প্রায় চার লাখ বস্তা আলু হিমাগার থেকে তোলেননি। এতে কৃষকদের প্রায় ৬০ কোটি টাকা এবং হিমাগার মালিকদের প্রায় দুই কোটি টাকা ক্ষতি হয়েছে। চলতি মৌসুমেও একই ধরনের পরিস্থিতির আশঙ্কা রয়েছে বলে জানান তিনি।
তিনি বলেন, এ সংকট থেকে উত্তরণে রংপুরে ন্যূনতম সহায়ক মূল্য, সহজ শর্তে কৃষিঋণ, রপ্তানি প্রণোদনা এবং আলুভিত্তিক শিল্পকারখানা গড়ে তোলা প্রয়োজন।
কৃষকদের নীতিগত সহায়তার দাবি জানিয়ে রংপুর আলুচাষি ও ব্যবসায়ী সমিতির সহসম্পাদক মোবারক হোসেন মনছুর বলেন, উৎপাদন খরচের সঙ্গে ৩৩ শতাংশ মূল্যসহায়তা যুক্ত করে আলুর দাম নির্ধারণ করা উচিত। একই সঙ্গে ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের তালিকা করে ক্ষতিপূরণের ব্যবস্থাও করতে হবে।
পীরগাছার অন্নদানগর গ্রামের কৃষক সাহেব আলী বলেন, ‘লাভের আশায় আলু চাষ করতে করতে ফকির হয়া গেছি। ঋণ করে চাষ করি, কিন্তু বছর শেষে লোকসান ছাড়া কিছুই পাই না।’
তারাগঞ্জের এনএন হিমাগারের সামনে কথা হয় লক্ষ্মীপুর গ্রামের আলুচাষি অহিদুল ইসলামের সঙ্গে। সরকারি নির্ধারিত দাম কার্যকর না হওয়ায় ক্ষোভ প্রকাশ করে তিনি বলেন, ‘সরকার আলুর কেজি ২২ টাকা নির্ধারণ করি দিয়া এসিত বসি চুপচাপ বসি আছে। এপ্যাকে আলু কায়ও নেওচে না। আলু ধরিয়া হামরা কান্দোচি।’
রংপুর বিভাগীয় আলুচাষি ও ব্যবসায়ী সমিতির সদস্যসচিব বিশ্বজিৎ বণিক বলেন, এবার ৪২ একর জমিতে আলু চাষ করে প্রায় সাড়ে ৭ হাজার বস্তা পেয়েছেন। লাভের আশায় আরও ১৭ হাজার বস্তা আলু কিনে হিমাগারে রেখেছেন। গত বছর প্রায় ৭০ লাখ টাকা লোকসান হয়েছে। এবার পরিস্থিতি আরও খারাপ হওয়ায় আলু চাষ থেকে সরে যাওয়ার কথা ভাবছেন তিনি।
রংপুর কৃষি বিপণন অধিদপ্তরের মাঠ ও বাজার পরিদর্শক মো. শাহজালাল ইসলাম বলেন, জনবলসংকটের কারণে আলুতে কৃষকের ক্ষতির সুনির্দিষ্ট পরিমাণ নির্ধারণ করা সম্ভব হচ্ছে না। তবে কৃষকের ব্যাপক লোকসান হচ্ছে বলে স্বীকার করেন তিনি।
এদিকে নতুন করে চলতি মৌসুমে আগাম জাতের আলু লাগানো শুরু করেছেন কৃষকেরা। বর্তমানে হিমাগার পর্যায়ে প্রতি কেজি আলু বিক্রি হচ্ছে ১১ থেকে ১৩ টাকা এবং খুচরা পর্যায়ে ১৪ থেকে ১৫ টাকায়।
কৃষকেরা বলছেন, উৎপাদন খরচের সঙ্গে বাজারদরের সামঞ্জস্য না থাকলে এবং সংরক্ষণ ও বিপণনব্যবস্থায় কার্যকর পরিবর্তন না এলে আলু চাষ তাদের জন্য আরও ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠবে। একসময় যে আলু ছিল কৃষকের ‘নগদ টাকার ফসল’, সেই আলুই এখন অনেকের কাছে ঋণ ও লোকসানের প্রতীকে পরিণত হয়েছে।