November 6, 2026, 11:03 am
শিরোনাম:
তারাগঞ্জে গাছের বুকে পেরেক, নীরবে ক্ষতবিক্ষত সবুজ প্রকৃতি তারাগঞ্জে মধ্যরাতে ইউএনওর অভিযান, ১১৭ বস্তা সার জব্দ, ব্যবসায়ীকে ৩০ হাজার টাকা জরিমানা সাংবাদিকরা সমাজের দর্পণ, কলম হোক অন্যায়-দুর্নীতির বিরুদ্ধে—তারাগঞ্জে মডেল প্রেসক্লাবের সদস্য বরণ মাদক নয়, মাঠেই গড়ুক আগামীর স্বপ্ন—তারাগঞ্জে নতুন কুঁড়ি স্পোর্টসের উদ্বোধন পারমাণবিক হামলার আশঙ্কা? নাগরিকদের বাঁচার কৌশল শেখাচ্ছে ইরান হাড়িয়ারকুঠি ডাংগীরহাটের জনসাধারণের ব্যবহারের টয়লেট, নাকি ময়লা-আবর্জনার ভাগাড়? গার্মেন্টস শ্রমিকদের আন্দোলনে প্রাণ গেল গাইবান্ধার তৌফিকের ৬ সন্তানের কেউই নিচ্ছেন না দায়িত্ব, জমি লিখে নিয়ে ৯৫ বছরের বৃদ্ধ বাবাকে গাছতলায় ফেলে গেলেন সন্তানেরা! তারাগঞ্জে মাদক সেবনের দায়ে যুবকের ১৫ দিনের কারাদণ্ড তারাগঞ্জের হাড়িয়ারকুঠি ইউপি পরিদর্শনে স্থানীয় সরকার বিভাগের যুগ্মসচিব

তারাগঞ্জে গাছের বুকে পেরেক, নীরবে ক্ষতবিক্ষত সবুজ প্রকৃতি

Reporter Name

বুলবুল হোসেন, তারাগঞ্জ (রংপুর) প্রতিনিধি:গাছ আছে বলেই প্রকৃতি এত সুন্দর, সজীব ও প্রাণবন্ত। অক্সিজেন সরবরাহ, কার্বন ডাই-অক্সাইড শোষণ, ছায়া প্রদান, ফল-ফুল ও ওষুধ জোগানোসহ পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষায় গাছের অবদান অপরিসীম। অথচ মানুষের সামান্য প্রচারের স্বার্থে সেই গাছের বুকেই নির্বিচারে ঠুকে দেওয়া হচ্ছে পেরেক। বিজ্ঞাপন, ব্যানার, ফেস্টুন ও সাইনবোর্ডের ভারে ক্ষতবিক্ষত হচ্ছে পরিবেশের অন্যতম বন্ধু বৃক্ষ। ৬ নভেম্বর (শুক্রবার) সরেজমিনে দেখা গেছে উপজেলার বিভিন্ন সড়ক ও জনবহুল এলাকার গাছের এমন ক্ষতবিক্ষত চিত্র।

রংপুরের তারাগঞ্জ উপজেলায় সড়কের দুপাশের গাছে গাছে পেরেক মেরে টাঙানো হচ্ছে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান, রাজনৈতিক নেতা, চিকিৎসক, কোচিং সেন্টার ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের বিজ্ঞাপন। এমনকি রাজনৈতিক কর্মসূচি, কেন্দ্রীয় নেতাদের আগমন এবং আসন্ন ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনকে সামনে রেখে সম্ভাব্য চেয়ারম্যান ও ইউপি সদস্য প্রার্থীদের প্রচারণার মাধ্যম হিসেবেও ব্যবহার করা হচ্ছে গাছকে।
উপজেলার বিভিন্ন সড়কের পাশে ছোট-বড় অসংখ্য গাছে পেরেক ঠুকে লাগানো হয়েছে টিনের সাইনবোর্ড, ব্যানার ও ফেস্টুন। কোথাও একই গাছে একাধিক বিজ্ঞাপন ঝুলছে।শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, কোচিং সেন্টার, ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান ও বিভিন্ন কোম্পানির প্রচারণার পাশাপাশি চিকিৎসক,রাজনৈতিক নেতা এবং পরিবহনসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বিজ্ঞাপনও রয়েছে এসব গাছে।

উপজেলার চিকলীবাজার থেকে সৈয়দপুর-রংপুর মহাসড়কের পাগলাপীর পর্যন্ত, তারাগঞ্জ নতুন চৌপথি থেকে অগ্রণী ব্যাংক মোড় ও বুড়িরহাট পর্যন্ত, পুরাতন চৌপথি থেকে ভীমপুর মেডিকেল মোড়, বামনডিঘী থেকে ডাঙ্গীরহাট সড়কসহ বিভিন্ন গ্রামীণ সড়কে এমন চিত্র চোখে পড়ে। শুধু সড়কের পাশেই নয়, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের প্রাঙ্গণ, বাজার ও জনবহুল এলাকার গাছেও পেরেক ঠুকে সাঁটানো হয়েছে নানা ধরনের প্রচারণামূলক সামগ্রী।

এ বিষয়ে সৈয়দপুর সরকারি বিজ্ঞান কলেজের উদ্ভিদবিজ্ঞান বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক কনক কান্তি সরকার বলেন, ‘গাছের পরিবহনব্যবস্থার প্রধান দুটি অংশ হলো জাইলেম ও ফ্লোয়েম। জাইলেম টিস্যুর মাধ্যমে মাটি থেকে পানি ও দ্রবীভূত খনিজ লবণ গাছের ওপরের অংশে পৌঁছায়। অন্যদিকে, পাতায় তৈরি হওয়া খাদ্য ফ্লোয়েম টিস্যুর মাধ্যমে গাছের বিভিন্ন অংশে পরিবাহিত হয়। গাছে পেরেক ঠুকে দিলে এসব পরিবহন টিস্যু ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। ছোট পেরেকের আঘাতেও ফ্লোয়েম ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা থাকে। আর বড় পেরেক গাছের ভেতরের পরিবহনব্যবস্থায় আঘাত করলে পানি ও খনিজ লবণ চলাচল বাধাগ্রস্ত হতে পারে।’

উপজেলার কাঠমিস্ত্রি পদ্ম রায় বলেন, ‘গাছে পেরেক মারার কারণে কাঠের ভেতরে লোহা থেকে যায়। পরে সেই কাঠ দিয়ে কাজ করতে গিয়ে আমাদের বিপাকে পড়তে হয়। অনেক সময় বাটালের ধার নষ্ট হয়ে যায়। কাজের সময় কাঠের ভেতরে পেরেক বা লোহা পাওয়া যায়।’

এ বিষয়ে তারাগঞ্জ উপজেলা বন কর্মকর্তা মো. আখতারুজ্জামান খান বলেন, ‘পেরেক দিয়ে গাছ ছিদ্র করে বিলবোর্ড, ব্যানার বা ফেস্টুন লাগানো আইনবিরোধী কাজ। তবে শুধু আইন প্রয়োগ করলেই হবে না, এ বিষয়ে জনসচেতনতা তৈরি করাও জরুরি। আমি তারাগঞ্জসহ তিনটি উপজেলার দায়িত্ব পালন করছি। অফিসে জনবলেরও সংকট রয়েছে। সড়কের গাছ থেকে বিলবোর্ড ও ফেস্টুন অপসারণের জন্য সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন দপ্তরে চিঠি দিয়েছি। দ্রুত অভিযান পরিচালনা করে এ বিষয়ে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।’

তারাগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. মোনাব্বর হোসেন বলেন, ‘গাছের গায়ে পেরেক ঠুকে ব্যানার ও ফেস্টুন লাগানো আইনত দণ্ডনীয় অপরাধ। এ ধরনের কাজ কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের ব্যানার ও ফেস্টুন খুলে নেওয়ার জন্য সময় দেওয়া হবে। এরপরও নির্দেশনা অমান্য করে কেউ এসব প্রচারণাসামগ্রী না সরালে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।’

বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের অধ্যাপক ও কলা অনুষদের ডিন এবং নদী ও পরিবেশবিষয়ক সংগঠন ‘রিভারাইন পিপল’-এর পরিচালক ড. তুহিন ওয়াদুদ বলেন, ‘প্রচার-প্রচারণার জন্য গাছকে বিজ্ঞাপনের খুঁটি হিসেবে ব্যবহার করা কোনোভাবেই কাম্য নয়। গাছের ক্ষতি না করে বিকল্প প্রচারমাধ্যম ব্যবহার করা সম্ভব। তাই পরিবেশ রক্ষায় সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানগুলোর দায়িত্বশীল আচরণের পাশাপাশি প্রশাসনের কার্যকর নজরদারি প্রয়োজন।’

প্রকৃতির ভারসাম্য রক্ষায় যে গাছ মানুষের জীবন বাঁচাতে প্রতিনিয়ত ভূমিকা রাখছে, সেই গাছের বুকেই পেরেক ঠুকে প্রচারণা চালানো কতটা যৌক্তিক—এ প্রশ্ন এখন তারাগঞ্জের সচেতন মহলের।


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *


ফেসবুকে আমরা