শফিউল মন্ডল(রংপুর):ঝড় নেই, বৃষ্টি নেই। চারপাশ ছিল শান্ত। রাতের খাবার শেষে স্বামী-স্ত্রী ও আট মাসের শিশুকে নিয়ে ঘুমিয়ে পড়েছিল পরিবারটি। কে জানত, সেই ঘুমই ২৪ বছর বয়সী দীপা রানীর জীবনের শেষ ঘুম হয়ে থাকবে!
বুধবার (৩০ সেপ্টেম্বর) রাত আনুমানিক আড়াইটার দিকে রংপুর সদর উপজেলার মমিনপুর ইউনিয়নের হাজরাহাটি ভরকুল এলাকায় হঠাৎ একটি বিশাল জোড়পাকড় গাছ ভেঙে দুটি টিনের ঘরের ওপর পড়ে। এতে ঘরের ভেতরে চাপা পড়ে ঘটনাস্থলেই মারা যান গৃহবধূ দীপা রানী (২৪)। গুরুতর আহত হন তাঁর স্বামী সজীব। তবে অলৌকিকভাবে অক্ষত অবস্থায় উদ্ধার করা হয় তাঁদের আট মাসের শিশুকে।
স্থানীয়রা জানান, গাছটি প্রায় আড়াইশ থেকে তিনশ বছরের পুরোনো বলে এলাকায় প্রচলিত রয়েছে। গাছটি ভেঙে পড়ার পর দুটি টিনের ঘর পুরোপুরি বিধ্বস্ত হয়ে যায়। ঘরের আসবাবপত্র, মালামাল ও একটি মোটরসাইকেলও ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
বিকট শব্দে পরিবারের সদস্য ও স্থানীয়রা ছুটে এসে উদ্ধারকাজ শুরু করেন। খবর পেয়ে ফায়ার সার্ভিসের সদস্যরা ঘটনাস্থলে পৌঁছে গাছ কেটে সরানোর কাজ শুরু করেন। দীর্ঘ চেষ্টার পর ধ্বংসস্তূপ সরিয়ে গৃহবধূ দীপা রানীর মরদেহ উদ্ধার করা হয়।
এ সময় তাঁর স্বামী সজীবকে গুরুতর আহত অবস্থায় উদ্ধার করে স্থানীয়ভাবে প্রাথমিক চিকিৎসা দেওয়া হয়। পরে তাঁকে রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাঠানো হয়। সেখানে তাঁর মাথায় প্রায় ১৩টি সেলাই দেওয়া হয়েছে বলে পরিবারের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে।
সবচেয়ে হৃদয়বিদারক ও বিস্ময়কর ঘটনা ঘটে আট মাসের শিশুটিকে উদ্ধারের সময়। বিশাল গাছের নিচে ঘরটি সম্পূর্ণ বিধ্বস্ত হলেও শিশুটিকে কোনো ধরনের আঘাত ছাড়াই জীবিত উদ্ধার করা হয়।
প্রত্যক্ষদর্শী পল্লী চিকিৎসক প্রফুল্ল রায় বলেন,আমার বাড়ি পাশেই। হঠাৎ বিকট শব্দ শুনে বাইরে এসে দেখি, বিশাল জোড়পাকড় গাছটি ঘরের ওপর পড়ে আছে।পরে স্থানীয়দের সঙ্গে উদ্ধারকাজে যোগ দিই। দীপা রানীকে গাছের নিচে মৃত অবস্থায় পাওয়া যায়। তাঁর স্বামীর মাথায় গুরুতর আঘাত ছিল। পরে ফায়ার সার্ভিস এসে গাছ সরিয়ে উদ্ধারকাজ সম্পন্ন করে।
নিহত দীপা রানীর শ্বশুর অমল রায় কান্নাজড়িত কণ্ঠে বলেন, ঝড় নেই, বৃষ্টি নেই—কীভাবে এমন ঘটনা ঘটল বুঝতে পারছি না। ভগবান আমার সংসারের সবকিছু তছনছ করে দিল। আমার তিনটি ঘরের মধ্যে দুটি শেষ হয়ে গেছে। এখন আমরা কোথায় থাকব, জানি না।
স্থানীয়রা জানান, বাড়িটির পাশে থাকা ওই পুরোনো জোড়পাকড় গাছকে ঘিরে এলাকায় নানা লোককথা ও ধর্মীয় বিশ্বাস প্রচলিত রয়েছে। গাছটির নিচে একটি কালীমন্দিরও রয়েছে।
আকস্মিক এ ঘটনায় এলাকায় শোকের ছায়া নেমে এসেছে। একদিকে স্বামী হাসপাতালে মৃত্যুর সঙ্গে লড়ছেন,অন্যদিকে গৃহবধূর মরদেহ বাড়িতে—আর ধ্বংসস্তূপ থেকে অক্ষত অবস্থায় উদ্ধার হওয়া আট মাসের শিশুটি যেন এই ভয়াবহ রাতের একমাত্র জীবন্ত স্মৃতি।