
নিজস্ব প্রতিবেদকপ্রান্তিক পর্যায়ের ক্ষুদ্র ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানকে মূল্য সংযোজন কর (ভ্যাট) ব্যবস্থার আওতায় আনতে নতুন উদ্যোগ নিয়েছে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর)। প্রাথমিক পরিকল্পনা অনুযায়ী, ইউনিয়ন, উপজেলা ও জেলা পর্যায়ের ছোট দোকান ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের জন্য মাসিক নির্দিষ্ট অঙ্কের ভ্যাট নির্ধারণের কথা ভাবা হচ্ছে।
এনবিআরের প্রাথমিক প্রস্তাব অনুযায়ী, ইউনিয়ন পর্যায়ের দোকান ও ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে মাসে ৫০০ টাকা, উপজেলা পর্যায়ে ১ হাজার টাকা এবং জেলা সদর ও জেলা পৌর শহর এলাকায় ২ হাজার টাকা হারে ভ্যাট নেওয়া হতে পারে। তবে এসব হার এখনো চূড়ান্ত হয়নি।
ভ্যাট পরিশোধের প্রক্রিয়া সহজ করতে মোবাইল ব্যাংকিংয়ের মাধ্যমে অর্থ জমা দেওয়ার সুযোগ রাখার পরিকল্পনাও করছে এনবিআর। ভবিষ্যতে এ কাজে আলাদা একটি অ্যাপ চালুর বিষয়েও চিন্তাভাবনা রয়েছে।
এনবিআর সূত্র জানায়, এরই মধ্যে দেশের বিভিন্ন উপজেলার বাজার, বিপণিবিতান ও দোকানের তথ্য সংগ্রহ শুরু হয়েছে। কোথায় কতটি দোকান রয়েছে, দোকানের ধরন কী এবং ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের অবস্থান কোথায়—এসব তথ্যের পাশাপাশি বিভিন্ন পরিসংখ্যান সংগ্রহ করা হচ্ছে। পরবর্তী ধাপে ইউনিয়ন পর্যায় থেকেও একই ধরনের তথ্য সংগ্রহ করা হবে।
এনবিআরের সংগৃহীত একটি তালিকা পর্যালোচনায় দেখা গেছে, ঠাকুরগাঁও সদর উপজেলার নুর নাহার প্লাজায় ৫২টি দোকান রয়েছে। এর মধ্যে চারটি দোকানে শীতাতপনিয়ন্ত্রণ যন্ত্র (এসি) রয়েছে। রংপুর সিটির বেতপট্টি বাজারে দোকানের সংখ্যা ১২১টি। অন্যদিকে কুড়িগ্রামের রৌমারী উপজেলার রৌমারী বাজারে রয়েছে ৫০টি দোকান।
দেশের বিভিন্ন প্রান্তের বাজার ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের তথ্য সংগ্রহের পর একটি পূর্ণাঙ্গ তালিকা তৈরি করা হবে। এরপর স্থানীয় ব্যবসায়ীদের সঙ্গে আলোচনা করে কোন ধরনের প্রতিষ্ঠানকে নির্ধারিত ভ্যাটের আওতায় আনা হবে, তা চূড়ান্ত করা হবে।
এনবিআর সূত্র বলছে, প্রাথমিকভাবে দেশের প্রান্তিক পর্যায়ের তিন থেকে পাঁচ লাখ ক্ষুদ্র ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানকে এই নির্ধারিত ভ্যাট ব্যবস্থার আওতায় আনার পরিকল্পনা রয়েছে।
এনবিআরের একজন কর্মকর্তা বলেন, উপজেলা পর্যায়ের বাজার, বিপণিবিতান ও দোকানের তালিকা ইতিমধ্যে ভ্যাট বিভাগের কর্মকর্তাদের হাতে আসতে শুরু করেছে। ইউনিয়ন পর্যায় থেকেও তথ্য সংগ্রহ চলছে। এসব তথ্য বিশ্লেষণ করার পর ভ্যাটের নির্ধারিত হার চূড়ান্ত করা হবে।
তিনি বলেন, প্রান্তিক ব্যবসায়ীদের জন্য ভ্যাট পরিশোধের প্রক্রিয়া সহজ করতে মোবাইল ব্যাংকিংয়ের মাধ্যমে ভ্যাট আদায়ের ব্যবস্থা চালুর পরিকল্পনা রয়েছে। ভবিষ্যতে এ কাজে একটি পৃথক অ্যাপও চালু করা হতে পারে।
নির্দিষ্ট হারে ভ্যাট আরোপের এই উদ্যোগ নতুন হলেও এর সঙ্গে পুরোনো প্যাকেজ ভ্যাট ব্যবস্থার মিল রয়েছে। প্রায় এক দশক আগে শহরাঞ্চলের ছোট ব্যবসায়ীদের লেনদেনের পরিমাণ বিবেচনা না করে নির্দিষ্ট হারে মাসিক ভ্যাট দিতে হতো। ওই ব্যবস্থা ‘প্যাকেজ ভ্যাট’ নামে পরিচিত ছিল। ২০১৯ সালে নতুন ভ্যাট আইন কার্যকর হওয়ার পর প্যাকেজ ভ্যাট ব্যবস্থা বাতিল করা হয়।
এনবিআরের নতুন পরিকল্পনা বাস্তবায়িত হলে অনেকটা সেই আদলেই ইউনিয়ন থেকে জেলা পর্যায়ের ছোট ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানকে নির্দিষ্ট অঙ্কের ভ্যাট দিতে হবে।
বর্তমান নিয়ম অনুযায়ী, কোনো ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের বার্ষিক বিক্রি বা লেনদেন ৫০ লাখ টাকার বেশি হলে ভ্যাট নিবন্ধন বাধ্যতামূলক। নিবন্ধিত প্রতিষ্ঠানের ক্ষেত্রে সাধারণত ১৫ শতাংশ হারে ভ্যাট প্রযোজ্য। অন্যদিকে ৫০ লাখ টাকার নিচে বার্ষিক বিক্রি বা লেনদেন করা ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের ভ্যাট নিবন্ধন বাধ্যতামূলক নয়।
এ অবস্থায় ভ্যাটের আওতা বাড়াতে ন্যূনতম নির্ধারিত ভ্যাট চালুর উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। এর মাধ্যমে বড় প্রতিষ্ঠানের পাশাপাশি দেশের প্রত্যন্ত এলাকার ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদেরও রাজস্ব ব্যবস্থার আওতায় আনার লক্ষ্য রয়েছে।
চলতি ২০২৬-২৭ অর্থবছরে এনবিআরের রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা ৬ লাখ ৪ হাজার কোটি টাকা। এর মধ্যে ভ্যাট খাত থেকে ২ লাখ ৫৭ হাজার কোটি টাকা আদায়ের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। এই লক্ষ্য অর্জনে ভ্যাট নিবন্ধিত প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা বাড়ানোর পাশাপাশি ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদেরও ভ্যাট ব্যবস্থার আওতায় আনার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।